
বাংলাদেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু দিন ক্যালেন্ডারের সাধারণ পাতার গণ্ডি পেরিয়ে চেতনার মূর্ত প্রতীকে পরিণত হয়। তেমনি এক অবিস্মরণীয় দিন ৫ আগস্ট। সুদীর্ঘ ১৭ বছরের জগদ্দল পাথরসম ফ্যাসিবাদী শাসন, গুম, খুন, গায়েবী মামলা, বাকস্বাধীনতা হরণ এবং শৃঙ্খলিত জনপদের বুক চিরে এদিন বাংলার আকাশে উদিত হয়েছিল এক রক্তিম নতুন সূর্য। এটি কেবল একটি সরকারের পতন নয়; এটি একটি গোটা জাতির আত্মমর্যাদা পুনরুদ্ধারের মহাকাব্যিক জয়।
১৭টি বছর বাংলাদেশের মানুষ যেভাবে জীবনযাপন করেছে, তা ভাষায় প্রকাশ করা দুঃসাধ্য। দেশে আইন ও আদালত ছিল, কিন্তু ছিল না কোনো আইনের শাসন। ছিল কেবল দুঃশাসন। রাষ্ট্র ছিল, কিন্তু ছিল না কোনো স্বাধীনতা। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব ছিল সম্পূর্ণ অরক্ষিত। সীমান্তে নির্বিচারে গুলি করে পাখির মতো মানুষ হত্যা করা হতো। বিডিআর বিদ্রোহ নামে দেশের চৌকুস সেনা অফিসারদের নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিলো। এর উদ্দেশ্য ছিলো দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীকে দুর্বল করা। শাপলা চত্বরে আলেম ওলামাদেরকে হত্যা ও নির্যাতন। ফেলানীকে হত্যা করে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল কাঁটাতারে। দেশের হাজার নয় লক্ষ কোটি টাকা লুটপাট ও পাচার করা হয়েছে। শেয়ার বাজার কেলেংকারী ও ব্যাক লুটপাট দেশকে তলাবিহীন ঝুড়িতে পরিনত করা হয়েছিলো। কানাডায় বেগম পাড়া করা হয়েছে।
গণতন্ত্র ও মানবাধিকারকে গলাটিপে হত্যা করা হয়েছিল। নিজ দেশেই মানুষ হয়ে পড়েছিল পরাধীন। আয়নাঘরে নির্বিচারে অমানবিক নির্যাতন চালিয়ে মানুষকে গুম ও খুন করা হতো। এমনকি বুড়িগঙ্গা নদীতে পেট কেটে মরদেহের সঙ্গে সিমেন্টের বস্তা বেঁধে পানিতে ডুবিয়ে দেওয়ার মতো পৈশাচিক ঘটনাও ঘটেছে।
২০০৬ সালের পর থেকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যে অন্যায্য ধারা সূচিত হয়েছিল, তা ধীরে ধীরে দেশকে এক অবরুদ্ধ কারাগারে পরিণত করেছিল। দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে হরণ করা হয়েছিল মানুষের মৌলিক অধিকার। বিচার বিভাগ ও প্রশাসনসহ প্রতিটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণের মাধ্যমে পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছিল। গণতন্ত্রের টুঁটি চেপে তৈরি করা হয়েছিল এক ভয়ের সংস্কৃতি, যেখানে ভিন্নমত পোষণ করাই ছিল অপরাধ। দিনের পর দিন গুম হওয়া স্বজনদের আর্তনাদ, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং লাখো তরুণের স্বপ্নভঙ্গ এই জাতিকে ঠেলে দিয়েছিল গভীর হতাশার অন্ধকারে। আমি ডামি আর নিশি রাতের তথাকথিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থাকে শেষ করে দেওয়া হয়েছিলো। সংবিধানে থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা যেদিন বাতিল করা হয়েছিলো। সেদিনই বাংলাদেশের গনতন্ত্র কে চিরোতরে কবর দেওয়া৷ হয়েছিলো। দেশে এক দলীয় শাসন ব্যবস্থা চালু করা হলো। মেধাবী শিক্ষার্থী আবরার কে কি নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়েছিলো তা ভাষায় বর্ননা করা দুষ্কর। বিশ্বজিৎ কে ছাত্রলীগ প্রকাশ্য দিবালোকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছিলো যা গোটা জাতি অবলোকন করেছেন।
তবে ইতিহাস সাক্ষী—কোনো অন্ধকারই চিরস্থায়ী নয়। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান প্রমাণ করেছে যে, দীর্ঘমেয়াদী নিপীড়ন দিয়ে কখনো চিরকাল একটি জাতিকে দাবিয়ে রাখা যায় না।
কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু হওয়া এই দাবি ধাপে ধাপে এক দফার আন্দোলনে রূপ নেয়। দেশের আপামর জনসাধারণ, ছাত্র, শ্রমিক, পেশাজীবী—সব শ্রেণি-পেশার মানুষ স্বৈরাচারের বুলেটকে উপেক্ষা করে রাজপথে নেমে আসে।
অবশেষে ৫ আগস্ট, ছাত্র-জনতার অবিস্মরণীয় বিপ্লবের মুখে ইতিহাসের নির্মম পরিণতি বরণ করে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয় স্বৈরাচারী সরকার। জনতার সমুদ্রসম বিজয়োল্লাসে কেঁপে ওঠে রাজধানী ঢাকাসহ সারা বাংলাদেশ। রাজপথে নেমে আসে মুক্তির আনন্দাশ্রু।
এই ১৭ বছরে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ও স্টিম রোলারের শিকার হতে হয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীবৃন্দের। বিশেষ করে বিএনপির চেয়ারপার্সন সাবেক প্রধানমন্ত্রী আপোষ দেশনেত্রী গনতন্ত্রের মা বেগম খালেদা জিয়াকে মিথ্যা বানোয়াট ও ভিত্তিহীন মামলায় তৎকালীন ফ্যাসিবাদী সরকার কারাগারে বন্দি রেখে বিনা চিকিৎসায় অযত্নে অবেহেলায় তার জীবন কে চরম ভাবে বিপন্ন করেছে। আধুনিক বাংলাদেশের রুপকার বহুদলীয় গনতন্ত্রের প্রবক্তা মহান স্বাধীনতার ঘোষক প্রয়াত রাষ্ট্র প্রতি শহীদ জিয়াউর রহমান এর বড় ছেলে আজকের বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কে বিনা অপরাধে গ্রেফতার ও নির্যাতন ছিলো ফ্যাসিবাদী সরকারে নীল নকশা। তিনি সুদুর যুক্তরাজ্য থেকে বিগত ১৭ বছরের আন্দোলনের সুযোগ্য ও বলিষ্ট নেতৃত্ব ও দিক নির্দেশনা না দিলে ৫ আগষ্টের ইতিহাস অন্যরকম রচিত হতো।
আরাফাত রহমান কোকো কে নির্যাতন করে মৃর্ত্যুর দিকে টেলে দিয়ে কবর বাসী করা হয়েছে। আমাদের সিলেটের কোটি মানুষের হ্রদয়ের স্পন্ধন এম ইলিয়াস আলী ছাত্রদল নেতা ইফতেখার আহমদ দিনার জুনেদ ও আনছার আলী কে গুম করা হয়েছে। আজ ও গুম হওয়া স্বজনদের অপেক্ষার প্রহর শেষ হয়নি। গুম হওয়া স্বজন দের আহাজারিতে আজ ও আকাশ বাতাস ভারী হয়ে আছে। গুম হওয়া মানুষের জন্য আজ ও অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন সন্তান হারা মা স্বামী হারা প্রিয়তমা স্ত্রী। ফ্যাসিবাদী সরকার চেয়েছিলো এশিয়া মহাদেশের সবচেয়ে বৃহত্তর ও জনপ্রিয় দল বিএনপিকে শেষ করে দিতে।
তৎকালীন সময়ে এমন বহু নেতাকর্মী আছেন, যাঁদের বিগত ১৭টি বছর কাটাতে হয়েছে পলাতক ও ফেরারি জীবন। ফ্যাসিবাদী সরকার প্রতিটি নেতাকর্মীর ওপর যে নিষ্ঠুর নিপীড়ন ও নির্যাতন চালিয়েছে, তার বর্ণনা দেওয়া অত্যন্ত কঠিন। মিথ্যা ও গায়েবী মামলা ছিল এই ফ্যাসিবাদী সরকারের প্রধান হাতিয়ার। এমন রেকর্ডও রয়েছে যেখানে মৃত ব্যক্তিরাও গায়েবী মামলা থেকে রেহাই পাননি। এমনকি জাতীয় পর্যায়ের অনেক নেতার বিরুদ্ধে পাঁচ শতাধিক পর্যন্ত মিথ্যা মামলা দেওয়ার নজির রয়েছে। হামলা, মামলা, নিপীড়ন আর নির্যাতন সহ্য করে ইস্পাতকঠিন দৃঢ়তায় এই স্টিম রোলার মোকাবিলা করে দাঁড়িয়ে থাকা দলটির নাম “বিএনপি”।
“বিএনপি যদি ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে এই দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে রাজপথে সরব না থাকত, তবে হয়তো ৫ আগস্টের সৃষ্টি হতো না। ৫ আগস্ট একদিনে আসেনি; এটি বিএনপির ১৭ বছরের দীর্ঘ আন্দোলনেরই এক অবধারিত ফসল—ছাত্র-জনতার বিপ্লব ও ঐতিহাসিক বিজয়।”
ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা ও আগামীর নতুন বাংলাদেশ বিনির্মানে বিএনপি তথা সরকারকে অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে।
এই মহিমান্বিত পরিবর্তন এবং দীর্ঘ লড়াইয়ে যারা নির্যাতিত মানুষের পক্ষে লড়াই করেছেন এবং জীবন বাজি রেখে আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে বুকের তাজা রক্ত ও আত্মদান করেছেন, তাদের অবদান ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। দীর্ঘ ১৭ বছরের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে রাজপথের আন্দোলন এবং আইনি লড়াইয়ে যারা নিজেদের ঘাম ঝরা পরিশ্রম সময় ও মেধা বাজি রেখেছিলেন, ৫ আগস্ট তাঁদের সেই ত্যাগের কাঙ্ক্ষিত সার্থকতা এনে দিয়েছে। এ বিজয় দেশের ছাত্র জনতা তথা আপামোর গনমানুষের।।
এই বিজয় কেবল একটি স্বৈরাচারের পতন নয়; এটি আইনের শাসন, ন্যায়বিচার এবং মানুষের মৌলিক অধিকার ফিরিয়ে পাওয়ার এক সোনালী সুযোগ। আমরা চাই নতুন বাংলাদেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হোক, চিরতরে অবসান ঘটুক বিচারহীনতার সংস্কৃতির এবং রচিত হোক একটি বৈষম্যহীন মানবিক সমাজ।
আজ ৫ আগস্ট আমাদের নতুন করে মনে করিয়ে দেয়—জনগণের ঐক্যের চেয়ে বড় কোনো শক্তি পৃথিবীতে নেই। শহীদের রক্তে ভেজা এই অর্জিত স্বাধীনতাকে রক্ষা করা আমাদের সকলের নৈতিক দায়িত্ব। দীর্ঘ ১৭ বছরের জঞ্জাল কাটিয়ে আমাদের এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে প্রতিটি নাগরিক তার মত প্রকাশের স্বাধীনতা ফিরে পাবে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত হবে এবং প্রতিষ্ঠিত হবে শোষণহীন এক মানবিক সমাজ।
গণতন্ত্র, মানবাধিকার, ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার এই অঙ্গীকারে আমরা আজও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
৫ আগস্ট কেবল একটি স্মরণীয় দিন নয়; এটি আমাদের চিরকালীন প্রেরণা—অন্যায় ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে চিরতরে মাথা উঁচু করে বাঁচার এক অবিনাশী মন্ত্র।
“বিএনপি যদি ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে এই দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে রাজপথে সরব না থাকত, তবে হয়তো ৫ আগস্টের সৃষ্টি হতো না। ৫ আগস্ট একদিনে আসেনি; এটি বিএনপির ১৭ বছরের দীর্ঘ আন্দোলনেরই এক অবধারিত ফসল- ছাত্র-জনতার বিপ্লব ও ঐতিহাসিক বিজয়।”
লেখক : এডভোকেট আল আসলাম মুমিন, সাংগঠনিক সম্পাদক- বিএনপি, সিলেট জেলা।